জ্বালানি সংকটে ট্রাকভাড়া বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের দামে চাপ
জ্বালানি তেলের সংকটে দেশের পরিবহন খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া এক লাফে বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে আমদানি–রপ্তানি পণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়েছে। এতে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।
ঢাকা ও ঢাকার বাইরের ব্যবসায়ীরা জানান, বগুড়া থেকে দূরের বিভিন্ন গন্তব্যে শাকসবজি পরিবহনের প্রতি ট্রাকে ভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। চট্টগ্রাম–ঢাকা রুটে পণ্য আনা–নেওয়ার খরচ বেড়েছে ৫–৬ হাজার টাকা। ঢাকার ভেতরেও ট্রাকভাড়া বেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেল–গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ কমিয়েছে এবং যানবাহনভেদে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়েছে। রেশনিং চালু হওয়ায় আতঙ্কে মানুষ দিন–রাত ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছেন। অনেক জায়গায় নির্ধারিত সীমার চেয়ে কম তেল পাচ্ছেন ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানচালকেরা—ফলে নিত্যপণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়ছে।
সবজি পরিবহনে ভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত
ভরা মৌসুমে বগুড়ার মহাস্থান হাট থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০০ ট্রাক সবজি ও আলুর চালান যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে। দুই সপ্তাহ আগেও ১০–১২ টন সবজি চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে পৌঁছাতে ট্রাকভাড়া ছিল ২৪–২৫ হাজার টাকা। সিলেটের ভাড়া ছিল ৩০ হাজার, আর ঢাকার কারওয়ান বাজার বা শ্যামবাজার পর্যন্ত ১৬ হাজার টাকা।
এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে তেলের বাজার অস্থির হওয়ায় মহাস্থান থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ট্রাকভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার টাকায়। সিলেট পর্যন্ত ভাড়া ৪০ হাজার টাকা, আর ঢাকার কারওয়ান বাজার বা শ্যামবাজার পর্যন্ত ২৫ হাজার টাকা।
মহাস্থান হাট কাঁচা ও পাকা মাল আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন,
“আমার নিজের ছয়টি ট্রাক আছে। পাম্প থেকে ২০ লিটারের বেশি তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তেলের অভাবে ট্রাকে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক মালিক তেলের অভাবে ট্রাক চলাচল বন্ধ রেখেছেন। এতে লোকসানে পড়েছেন কৃষক।”
নির্মাণ খাতেও চাপ—রড পরিবহনে ভাড়া বাড়তি
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরুর পর থেকে বড় ব্র্যান্ডের রডের দাম টনপ্রতি ৯০ হাজার থেকে বেড়ে ৯৪ হাজার টাকায় উঠেছে। এখন জ্বালানি সংকটে রড পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়েছে।
আকিজ রিসোর্স গ্রুপের চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার তৌফিক হাসান জানান,
ফিলিং স্টেশনে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৩–৪ ঘণ্টা বেশি সময় লাগছে। এতে পণ্য সরবরাহের শিডিউল বিপর্যস্ত হচ্ছে।
ঢাকায় রড পরিবহনে ট্রাকভাড়া ৩–৪ হাজার টাকা বেশি দাবি করছেন পরিবহনমালিকেরা। আগে ৪–৫টি ট্রিপ করা গেলেও এখন ১–২টির বেশি সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী।
পোশাক রপ্তানিকারকেরা দুশ্চিন্তায়
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানাগুলোকে নিজ খরচে কাভার্ড ভ্যানে পণ্য বন্দরের কনটেইনার ডিপোতে পৌঁছে দিতে হয়। তেলসংকটে এই ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
গত কয়েক দিনে ঢাকা থেকে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ১০–১২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১৫–১৬ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ভাড়া ১৫–১৬ হাজার থেকে বেড়ে ২০–২২ হাজার টাকা।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন,
“তেলসংকটের কারণে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ইতিমধ্যে বেড়েছে। ঈদের আগে কয়েক দিন পণ্য পাঠানোর চাপ থাকবে। তখন ভাড়া আরও বাড়বে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় আছি।”
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন,
জ্বালানি রেশনিং ইতিবাচক হলেও এটিকে পুঁজি করে পরিবহন ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। নিত্যপণ্য পরিবহনে তেল সরবরাহে ছাড় দেওয়া যেতে পারে—তবে কঠোর তদারকি জরুরি।
তিনি আরও বলেন, এমন আকস্মিক সংকট মোকাবিলায় অন্তত তিন মাসের জ্বালানি মজুত থাকা প্রয়োজন।



আপনার মতামত লিখুন
Array