খোলস ছেড়ে রাজনীতিতে ফেরার কৌশলে আওয়ামী লীগ
তৃণমূল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ছক কষছে আওয়ামী লীগ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর তীব্র জনরোষ এবং আইনি নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা আওয়ামী লীগ এখন অস্তিত্ব রক্ষার নতুন সমীকরণ মেলাচ্ছে। সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে ফেরার পথ কণ্টকাকীর্ণ হওয়ায় দলটি এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনকে ‘রাজনৈতিক এন্ট্রি পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহারের কৌশল নিয়েছে।
দলীয় নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং আত্মগোপনে থাকা একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় কমান্ডের নির্দেশে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা এখন থেকেই স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন: ফিরে আসার সিঁড়ি
৫ আগস্টের পর দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনসহ জেলা পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের প্রায় সবাই অপসারিত বা পলাতক রয়েছেন। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন থেকে ঈদের পর পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ইঙ্গিত পাওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে আওয়ামী লীগ।
দলটির কৌশলের মূল দিকগুলো হলো:
-
নির্দলীয় প্রতীকের আশা: আওয়ামী লীগ নেতারা এখন মনে করছেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করলে নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের অংশগ্রহণ জটিল হবে। তাই তারা ভেতরে ভেতরে স্থানীয় নির্বাচন ‘নির্দলীয়’ করার পক্ষে মত দিচ্ছেন, যাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাদের সমর্থকরা মাঠে থাকতে পারেন।
-
ব্যক্তিগত প্রভাব কাজে লাগানো: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত প্রভাব ও পারিবারিক পরিচিতি বেশি গুরুত্ব পায়। আওয়ামী লীগ এই সুযোগটিই নিতে চায়।
-
মামলা ও জামিন: স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে কারাগারে থাকা ও আত্মগোপনে থাকা নেতাদের দ্রুত জামিন এবং আইনি লড়াইয়ে জোর দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
আইনজীবী সমিতিতে সাফল্যের ‘টনিক’
আওয়ামী লীগের এই নতুন আত্মবিশ্বাসের জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে সাম্প্রতিক বিভিন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ফলাফল। গত কয়েক মাসে কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেলগুলো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে জয়লাভ করেছে।
বিশেষ করে কক্সবাজারে ১৭টির মধ্যে ৭টি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সভাপতিসহ ১০টি পদে জয় দলটিকে আশাবাদী করে তুলেছে। আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে তারা এখন এসিড টেস্ট হিসেবে দেখছে।
বিশ্লেষকদের ভাবনা: রাজনীতিতে ফেরা কি এতই সহজ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য একটা সুযোগ হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন:
“স্থানীয়ভাবে অনেক জনপ্রিয় ব্যক্তি যারা আগে সুযোগ পাননি, তারা হয়তো এবার নির্বাচনে অংশ নেবেন। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন কেবল নির্বাচন দিয়ে সম্ভব নয়। দলটির নেতৃত্বের মধ্যে অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে এখনো কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। ফলে জাতীয়ভাবে ফিরতে হলে তাদের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।”
জনতা নিউজের পর্যবেক্ষণ
আওয়ামী লীগ যখন স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন কি তারা করতে পেরেছে? একদিকে আত্মগোপনে থাকা শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল নির্দেশনা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে কর্মী সংকট—সব মিলিয়ে স্থানীয় নির্বাচনই হতে যাচ্ছে দলটির টিকে থাকার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সরকার যদি শেষ পর্যন্ত স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আওয়ামী লীগের কৌশলী অবস্থান নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।



আপনার মতামত লিখুন
Array